মুরগির সালমোনেলা কি?
সালমোনেলা একটি ব্যাকটেরিয়া যা মুরগি এবং অন্যান্য হাঁস-মুরগির শরীরে সংক্রমণ ঘটাতে পারে। এটি সাধারণত পরিপাকতন্ত্রে অবস্থান করে এবং খাদ্য সংক্রমণের মাধ্যমে মানুষের শরীরেও প্রবেশ করতে পারে। সালমোনেলা সংক্রমণ হলে মুরগির উৎপাদন কমে যায়, ডিমের সংখ্যা হ্রাস পায় এবং মৃত্যুর হার বেড়ে যেতে পারে।
মুরগির সালমোনেলা সংক্রমণের কারণ
মুরগির সালমোনেলা সংক্রমণের প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে:
- অস্বাস্থ্যকর খামার ব্যবস্থাপনা: অপরিষ্কার পানীয় জল, দূষিত খাদ্য এবং অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ সংক্রমণের প্রধান কারণ।
- সংক্রমিত মুরগি: অসুস্থ মুরগির সংস্পর্শে সুস্থ মুরগির মধ্যে ব্যাকটেরিয়া ছড়িয়ে পড়তে পারে।
- দূষিত খাবার ও পানি: খাদ্যের মধ্যে ব্যাকটেরিয়া থাকলে মুরগির শরীরে এটি সহজেই সংক্রমণ ঘটায়।
- পরজীবী ও ইঁদুরের সংক্রমণ: ইঁদুর, পোকামাকড় ও অন্যান্য প্রাণীর মাধ্যমে সালমোনেলা দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে।
- অস্বাস্থ্যকর ডিম সংরক্ষণ: সালমোনেলা সংক্রমিত ডিম খেলে এটি মুরগির শরীরে প্রবেশ করতে পারে।
মুরগির সালমোনেলা রোগের চিকিৎসা

আমি আমার খামারে আক্রান্ত হাঁস, মুরগি ও কবুতর এর সালমোনেলা রোগের চিকিৎসার জন্য নিচের এই পদ্ধতি ফলো করিঃ
- মোক্সাসিল ক্যাপসুলের ১টির ২ ভাগের ১ ভাগ
- ফিলমেট ২০০ ট্যাবলেটের ১ টির ২ ভাগের ১ ভাগ
- সিভিট পুরো ১ টি
সবগুলো ঔষুধ একসাথে ১০ মিলি পানির সাথে মিশিয়ে সরাসরি মুখে খাওয়ায় দিনে ২ বার করে ৩ থেকে ৫ দিন। সরাসরি হাঁস, মুরগি ও কবুতরের মুখে ঔষুধ খাওয়ানোর সময় অব্যশই খেয়াল রাখতে হবে শ্বাসনালীর মধ্যে যেনো প্রবেশ না করে।
মুরগির সালমোনেলা সংক্রমণের লক্ষণ
মুরগিতে সালমোনেলা সংক্রমণের লক্ষণগুলো নিম্নরূপ:
- অসুস্থতা ও দুর্বলতা: মুরগি কাঁপতে থাকে এবং দুর্বল হয়ে পড়ে।
- ক্ষুধামন্দা: মুরগির খাওয়ার আগ্রহ কমে যায়।
- ডায়রিয়া: পাতলা ও দুর্গন্ধযুক্ত মলত্যাগ হয়।
- ডিম উৎপাদন হ্রাস: সংক্রমণের ফলে মুরগির ডিম উৎপাদন কমে যায়।
- শ্বাসকষ্ট: কিছু ক্ষেত্রে মুরগির শ্বাসকষ্ট হতে পারে।
- মৃত্যুর হার বৃদ্ধি: সংক্রমণ মারাত্মক হলে মুরগির মৃত্যু হতে পারে।
মুরগির সালমোনেলা সংক্রমণের প্রতিকার
সালমোনেলা প্রতিরোধ ও প্রতিকারের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিচে আলোচনা করা হলো:
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা – খামার ও মুরগির থাকার পরিবেশ পরিষ্কার রাখা খুবই জরুরি। প্রতিদিন খামার পরিষ্কার করতে হবে এবং নোংরা ও দূষিত পানি পরিবর্তন করতে হবে। মুরগির খাবারের পাত্র এবং পানি ধারক নিয়মিত জীবাণুমুক্ত করা প্রয়োজন।
স্বাস্থ্যকর খাবার ও পানি সরবরাহ – সালমোনেলা সংক্রমণ রোধের জন্য পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত খাবার ও পানি সরবরাহ করা উচিত। খাবার সংরক্ষণে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে যাতে এতে ব্যাকটেরিয়া জন্ম না নিতে পারে।
টিকা প্রদান – সালমোনেলা প্রতিরোধে নিয়মিত টিকা প্রদান করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মুরগির বয়স অনুযায়ী যথাযথ টিকা দিতে হবে যাতে তারা এই ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে।
অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার – সংক্রমিত মুরগির চিকিৎসার জন্য উপযুক্ত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে, পশুচিকিত্সকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ ব্যবহার করা উচিত নয়। সাধারণত এনরোফ্লক্সাসিন, সিপ্রোফ্লক্সাসিন, এবং অক্সিটেট্রাসাইক্লিন জাতীয় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়।
সংক্রমিত মুরগি আলাদা রাখা – যে মুরগিগুলো সংক্রমিত হয়েছে, তাদের সুস্থ মুরগি থেকে আলাদা রাখতে হবে। এতে সংক্রমণের বিস্তার রোধ করা সম্ভব হবে।
খামারের পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ – খামারের ভেতর পর্যাপ্ত আলো ও বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা থাকতে হবে। অতিরিক্ত আর্দ্রতা ও গরম পরিবেশ ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধিতে সহায়ক, তাই তা নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন।
পরজীবী নিয়ন্ত্রণ – ইঁদুর, পোকামাকড় এবং অন্যান্য পরজীবীর মাধ্যমে সালমোনেলা ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই খামারে কীটনাশক ব্যবহার করে এদের সংখ্যা কমিয়ে আনতে হবে।
সংক্রমণ পরীক্ষা – খামারে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা উচিত। বিশেষ করে নতুন মুরগি কিনলে, তাদের প্রথমে কোয়ারেন্টাইনে রাখা উচিত এবং পরে অন্য মুরগির সাথে মিলিয়ে দেওয়া উচিত।
মানুষের জন্য সতর্কতা
সালমোনেলা শুধু মুরগির জন্যই ক্ষতিকর নয়, এটি মানুষের শরীরেও সংক্রমণ ঘটাতে পারে। এজন্য কিছু সতর্কতা নেওয়া প্রয়োজন:
- কাঁচা ডিম বা অপর্যাপ্ত রান্না করা মুরগির মাংস খাওয়া উচিত নয়।
- মুরগির গোশত বা ডিম কাটার পর হাত ভালোভাবে ধুয়ে নিতে হবে।
- রান্নাঘরের উপকরণ যেমন ছুরি, কাটিং বোর্ড ইত্যাদি আলাদা রাখা উচিত যাতে সংক্রমণ না ছড়ায়।
- ভালোভাবে সিদ্ধ করা খাবার গ্রহণ করা উচিত।
সালমোনেলা মুরগির জন্য একটি গুরুতর রোগ হলেও, সঠিক পরিচর্যা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে এটি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, স্বাস্থ্যকর খাদ্য সরবরাহ, টিকা প্রদান, ও সংক্রমিত মুরগিকে আলাদা রাখার মাধ্যমে সালমোনেলা সংক্রমণ প্রতিরোধ করা যায়। এ রোগের সঠিক প্রতিকার ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ করলে খামারের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাবে এবং অর্থনৈতিক ক্ষতি কম হবে।